২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংশোধিত বাজেট

বিদ্যুৎ কেনায় সরকারি কেন্দ্রে ব্যয় কমল, বাড়ছে আইপিপিতে

চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে সরকারি ও বেসরকারি খাতের কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ কেনায় মোট ১ লাখ ৫ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা ব্যয় করবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।

চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে সরকারি ও বেসরকারি খাতের কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ কেনায় মোট ১ লাখ ৫ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা ব্যয় করবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। অর্থবছরের শুরুতে এজন্য বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ৮ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে বিদ্যুৎ কেনায় সংস্থাটির ব্যয় কমছে ৩ হাজার ৩১২ কোটি টাকা। সামগ্রিকভাবে বাজেটে সরকারি ও যৌথ মালিকানাধীন কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনায় ব্যয় কমলেও বেসরকারি খাতের বিশেষ করে আইপিপি ও এসআইপিপি থেকে বিদ্যুৎ কেনায় বিপিডিবির ব্যয় বাড়ছে।

সংশোধিত বাজেট অনুসারে চলতি অর্থবছরে আইপিপি ও এসআইপিপি কেন্দ্রগুলো থেকে ৪৩ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কিনবে বিপিডিবি। যেখানে মূল বাজেটে এ খাত থেকে ৩৯ হাজার ৭৯৬ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কেনার পরিকল্পনা ছিল। ফলে সংশোধিত বাজেটে এ খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনায় ব্যয় বেড়েছে ৪ হাজার ১৯১ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে আইপিপি ও এসআইপিপি থেকে ৩৯ হাজার ২৪২ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কিনেছিল বিপিডিবি।

বেসরকারি বিদ্যুৎ উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিআইপিপিএ) সভাপতি কেএম রেজাউল হাসানাত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আইপিপি থেকে বার্ষিক বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রে সরকার প্রতি বছর একটি হিসাব করে। সংশোধিত বাজেটে বিদ্যুৎ কিনতে খরচ বাড়ালে সেক্ষেত্রে আইপিপি থেকে বেশি বিদ্যুৎ কিনবে কিনা সেটি জানা নেই। তবে আইপিপিগুলোর বাড়তি বিদ্যুৎ দেয়ার মতো জ্বালানি সক্ষমতা নেই।’

আদানির কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনায় চলতি অর্থবছরে ১২ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা ব্যয় হবে। মূল বাজেটে কেন্দ্রটি থেকে ১২ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কেনার প্রাক্কলন ছিল। গত অর্থবছরে আদানির কাছ থেকে ১২ হাজার ১৪৭ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কিনেছিল বিপিডিবি।

বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেডের (বিসিপিসিএল) কাছ থেকে কেনা হবে ১১ হাজার ৭৪৩ কোটি টাকার বিদ্যুৎ। মূল বাজেটে এর পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে কেন্দ্রটি থেকে ৮ হাজার ৯৩২ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কেনা হয়েছিল।

বাংলাদেশ ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (বিআইএফপিসিএল) কাছ থেকে চলতি অর্থবছরে ১০ হাজার ৪৩৮ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কেনা হবে। এর আগে মূল বাজেটে কেন্দ্রটি থেকে ১০ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কেনার প্রাক্কলন করা হয়েছিল। গত অর্থবছরে এ কেন্দ্রটি থেকে ৪ হাজার ২৯৮ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কিনেছিল বিপিডিবি।

ভারতের বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনতে চলতি অর্থবছরে ব্যয় হবে ৭ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। যেখানে মূল বাজেটে এর পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে এক্ষেত্রে ৭ হাজার ২৬৫ কোটি টাকার বিদ্যুৎ আমদানি করেছিল বিপিডিবি।

কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিপিজিসিবিএল) কাছ থেকে চলতি অর্থবছরে কেনা হবে ৬ হাজার ৪৫৮ কোটি টাকার বিদ্যুৎ। যেখানে মূল বাজেটে কেন্দ্রটি থেকে ১২ হাজার ৩৮২ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কেনার প্রাক্কলন ছিল। গত অর্থবছরে কেন্দ্রটি থেকে ১ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কেনা হয়েছিল।

আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেডের কাছ থেকে ৪ হাজার ৬১ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কেনা হবে। এর আগে মূল বাজেটে এর পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা। নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনডব্লিউপিজিসিএল) কাছ থেকে কেনা হবে ৩ হাজার ২১৭ কোটি টাকার বিদ্যুৎ। মূল বাজেটে কেন্দ্রটি থেকে ২ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কেনার প্রাক্কলন ছিল। ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেডের (ইজিসিবি) কাছ থেকে চলতি অর্থবছরে ২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কিনবে বিপিডিবি। এর আগে মূল বাজেটে এর পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা।

বিপিডিবি ও আরপিসিএল পাওয়ার জেনারেশনের (বি-আর পাওয়ারজেন) লিমিটেডের কাছ থেকে কেনা হবে ১ হাজার ৬৬১ কোটি টাকার বিদ্যুৎ। মূল বাজেটে এর পরিমাণ ছিল ৬৮৩ কোটি টাকা।

ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর কাছ থেকে চলতি অর্থবছরে ৮৩১ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কিনবে বিপিডিবি। যেখানে মূল বাজেটে এ কেন্দ্রগুলো থেকে ৫৫৬ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কেনার প্রাক্কলন করা হয়েছিল। রুরাল পাওয়ার কোম্পানির কাছ থেকে ৭৭২ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কেনা হবে। মূল বাজেটে এর পরিমাণ ছিল ৩০৪ কোটি টাকা।

আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেডের কাছ থেকে চলতি অর্থবছরে ৪৮৫ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কিনবে বিপিডিবি। এর আগে মূল বাজেটে কেন্দ্রটি থেকে ৫ হাজার ৭২২ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কেনার প্রাক্কলন করা হয়েছিল। হরিপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে চলতি অর্থবছরে ৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকার বিদ্যুৎ কেনা হবে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে আরএনপিএলের (আরপিসিএল-নরিনকো) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. সেলিম ভূঁইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পায়রায় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চলতি অর্থবছরে পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করার কথা ছিল। পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালানো গেলে অর্থবছরে সাড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকার মতো বিদ্যুৎ কেনায় ব্যয় হতো সরকারের। কেন্দ্রটিতে সঞ্চালন লাইনের কারণে বিলম্বে উৎপাদন শুরু হয়েছে। এ কারণে চলতি অর্থবছরে একটি ইউনিট চালিয়ে যতটুকু বিদ্যুৎ সরবরাহ হবে তাতে খুব বেশি বিদ্যুতের বিল হবে না। যে কারণে সংশোধিত বাজেটে ব্যয় কমে গিয়েছে।’

সংশোধিত বাজেট অনুসারে, চলতি অর্থবছরে বিপিডিবির মোট আয় হবে ১ লাখ ১৬ হাজার ৭১১ কোটি টাকা এবং এর বিপরীতে মোট ব্যয় হবে ১ লাখ ২১ হাজার ৯১৬ কোটি টাকা। এতে অর্থবছর শেষে সংস্থাটির ঘাটতি দাঁড়াবে ৫ হাজার ২০৪ কোটি টাকায়। গত অর্থবছরেও বিপিডিবির ৫ হাজার ২৩০ কোটি টাকার ঘাটতি ছিল। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি বাবদ বিপিডিবির জন্য ৪৫ হাজার ৫ কোটি টাকার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। গত অর্থবছরে সংস্থাটিকে দেয়া ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৩৮ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা।

বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিমের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বললে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে সংস্থাটির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতি বছর বিদ্যুতের চাহিদার প্রাক্কলন করে বিদ্যুৎ ক্রয়ের হিসাবে করা হয়। সেক্ষেত্রে কোন কোন কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ কেনা হবে এবং জ্বালানির দাম সংশ্লিষ্ট সময়ে কী থাকতে পারে সে বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে বাজেটে হিসাব করা হয়। প্রায় ছয় মাস ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য কমে গেছে। এছাড়া রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ কেনার প্রাক্কলন ছিল। সেখানেও একটা বড় ব্যয় ধরা হয়েছিল। যেহেতু কেন্দ্রটি উৎপাদনে আসেনি। ফলে সংশোধিত বাজেটে খরচ কম হবে এটাই স্বাভাবিক।’

আরও